Tuesday, 20 August 2013

অর্ণব চক্রবর্তীর গল্প

আওয়াজ

একটা আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল৷

--খস্‌‌খস্!

গাঢ় অন্ধকার৷ চোখ চলে না৷ মনে করতে পারিনা কিছুক্ষণ কোথায় আছি৷ বিছানায় শুয়ে আছি এটুকু বুঝতে পারি৷ আধা উপুড় হয়ে৷ নিথর হয়ে কান পেতে থাকি--

--খস্‌‌খস্ খস্ খস্!

নাঃ শোনার ভুল নয়৷ খুব জোরে নয়৷ মৃদু কিন্তু সুস্পষ্ট৷ ডান হাতের আঙুলে কি যেন একটা স্পর্শ হচ্ছে৷ মনোযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি কি সেটা৷ এক তাড়া কাগজ, একটা ফাইলের কোনা৷ আমি বিছানায় শুয়ে আছি, একটা খোলা ফাইলের পাশে--

হ্যাঁ, মনে পড়েছে আমি কোথায়৷ জায়গাটার নাম কাভালুর, ব্যাঙ্গালোরের কাছে৷ এখানে ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থার একটা মানমন্দির আছে৷ আমি সেখানে এসেছি একটা {\rm seminar}-এ৷ গতকাল দিনের বেলায় আমার প্রথম লেকচার ছিল, কাল আরেকটা৷ আজ রাতে ওদের ক্যাম্পাসের গেষ্ট হাউসে রয়েছি৷

আমি এখনও অনড় হয়ে শুয়ে আছি৷ কিন্তু মাথাটা এখন পুরো সাফ হয়ে গিয়েছে৷ কিন্তু তবু একটা অনির্দেশ্য ভয় যেন ষষ্ঠেন্দ্রিয়কে জাগিয়ে তুলেছে, নড়তে দিচ্ছে না৷ প্রতিটা শব্দ কান খাড়া করে শুনছি৷ ফ্যানের শব্দ৷ পুরোণো ফ্যান৷ একটা চাপা ঝিঁঝির শব্দ৷ জানালায় ভারী পর্দা, বাইরের কোনো আলো বা শব্দ ঢোকা কঠিন৷

--খস্‌‌খস্৷ খস্‌‌স্‌‌স্--

এবার যেন শব্দটা কিছু বেশীক্ষণ স্থায়ী হল৷ আওয়াজটা হচ্ছে আমার পায়ের দিক থেকে, ঘরের কোনায়, মেঝের কাছে৷ শব্দটার উৎসটা কল্পনা করার চেষ্টা করি৷ মেঝেতে জায়গায় জায়গায় নারকেলের ছোবড়ার মাদুর পাতা আছে৷ সেই মাদুরের গায় কিছু ঘষ্‌‌টে এগোলেই এরকম শব্দ সম্ভব৷

এই কথাটা মনে হওয়ামাত্রই একটা ঠান্ডা স্রোত খেলে গেল শিরদাঁড়া বেয়ে৷ জায়গাটা ঘন বনের মধ্যে একটা অনুচ্চ পাহাড়ের উপরে৷ শুনেছি চারধারের জঙ্গলে বন্যজন্তু আছে৷ পুরো ক্যাম্পাস যে বৈদ্যুতিক তারে ঘেরা সেটা দেখিয়েছিলেন উদ্যোক্তারাই৷

'কি আছে ওই জঙ্গলে?' নিছক কৌতূহলে জিজ্ঞাসা করেছিলাম৷

'এক সময়ে নাকি চিতাবাঘ ছিল,' তাচ্ছিল্যভরে বলেছিলেন আমার পথপ্রদর্শিকা, 'তবে এখন ওসব কিছু নেই, বোধহয় কিছু বুনো শুয়োর-টুয়োর আছে৷ তবে মাঝে মাঝে হাতির উপদ্রব হয়৷ কিন্তু সে কালে ভদ্রে৷ তবে যেটার ভয় সবচেয়ে বেশী, সেটা হল সাপ৷' ওই প্রাণীটিকে বৈদ্যুতিক তারে আটকে রাখা কঠিন৷ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় গর্ত দেখিয়ে বলেছিলেন বেশ কিছু রোমহর্ষক গল্প৷ রাতের বেলা সাপের উপদ্রব বেশী৷ মানমন্দিরের কাজে ব্যাঘাত হবার ভয়ে এখানে সন্ধ্যা থেকেই নিষ্প্রদীপ অবস্থা চলে৷ তখন চলার পথে সাবধান৷ টর্চ ছাড়া বেরোবেন না, আর শোবার আগে ঘরের কোনাগুলো ভালো করে দেখে নেবেন৷

তখন চোখ বড় বড় করে মাথা নেড়েছিলাম৷

কিন্তু গতরাতে শোবার আগে কোনাগুলো সত্যই দেখে শুয়েছিলাম কি?

আমার প্রতিটি স্নায়ু এখন অত্যন্ত সজাগ হয়ে উঠেছে৷ মনশ্চক্ষে সাপটার গতিবিধি আন্দাজ করার চেষ্টা করছি৷ আওয়াজটা অনেকক্ষণ হচ্ছে না৷ সেটা ভালো কথা নয়৷ হয়তো সাপটা নারকেল ছোবড়ার মাদুর পার করে মসৃণগতিতে এখন মেঝের উপর দিয়ে গড়িয়ে খাটের দিকে আসছে৷ হয়তো বা পায়া বেয়ে উঠছে৷ আমি সম্পূর্ণ অনড় হয়ে থাকি৷ শুনেছি সাপ খুব বোকা হয়৷ গায়ের উপর দিয়ে চলে গেলেও বোঝেনা৷ খালি নড়তে দেখলেই ছোবল মারে৷

--খস্‌‌খস্!

ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল৷ আওয়াজটা একই কোনা থেকে আসছে৷ তার মানে সাপটা অন্ততঃ খাটের খুব কাছে নেই৷ অন্ততঃ ওই সাপটা নেই৷ ঘরে আরো কতগুলো কিলবিল করছে কে জানে! কিন্তু এভাবে ভাবলে মানসিক দৌর্বল্য বাড়বে বই কমবে না৷ মাথা ঠান্ডা রেখে ঘরের ভূগোলটা এঁকে নেবার চেষ্টা করি মনে মনে৷

ঘরটা নিরন্ধ্র অন্ধকার৷ গতকাল শোবার আগে যেটুকু দেখেছিলাম সেই স্মৃতিই ভরসা৷ ঘরে দুটো ছোটো খাট ছিল মনে আছে৷ মাঝে মিটারখানেক ফাঁক৷ সেখানেও মেঝেতে খানিকটা ছোবড়ার মাদুর পাতা৷ দরজা দিয়ে ঢুকেই যে খাটটা তার উপরে আমি আমার ব্যাগ এবং জামাকাপড় ডাঁই করে রেখেছিলাম শোবার আগে৷ জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখার অভ্যাস আমার নেই৷ তাছাড়া প্রথম দিনের ক্লান্তির পর ঘর গোছানো নিয়ে মাথা ঘামাইনি৷ বিশেষতঃ একটা ফাঁকা খাট যখন আছেই৷ খালি এই দিকের খাটটায় একটা ফাইল নিয়ে শুয়ে পড়েছি৷ কি কি আছে এই বিছানায় হাতের কাছে? বালিশ নেই, ও বস্তুটা আমি ব্যবহার করি না৷ তাই দুটো বালিশই পাশের খাটে৷ অবশ্য বিষধর সাপের বিরুদ্ধে বালিশ যে খুব যুৎসই অস্ত্র এমন বলা যায় না৷ একটা পাতলা কম্বল আছে, সেটা বরং সাপের উদ্যত ফণার উপর চাপা দেওয়ার পক্ষে ভালো৷ আর আছে ফাইলটা৷ কিন্তু টর্চটা কোথায়? স্পষ্ট মনে আছে ব্যাগ থেকে বার করেছি গতরাতে৷ তারপর ওটা রেখেছিলাম {\rm CD}-র বাক্সের উপর সেটাও স্পষ্ট স্মরণ হচ্ছে৷ কিন্তু সেটা ছিল ওই খাটে৷ এই খাটে তো শোবার সময়ে ফাইল ছাড়া কিছুই ছিল না হাতে৷ তার মানে টর্চটা পড়ে আছে পাশের খাটেই৷ মাত্র মিটারখানেক দূরে৷ আমার খাট থেকে মেঝেতে খালি এক পা ফেলে হাত বাড়ালেই পেয়ে যাব৷ হয়তো বা একটু হাতড়াতে হবে৷ কিন্তু সেটা বড় কথা নয়৷ বড় কথা হচ্ছে একটা পা মেঝেতে রাখা৷ যে মেঝেতে ঘুরে বেড়াচ্ছে অজানা সরীসৃপ৷

আওয়াজটা অনেকক্ষণ হচ্ছে না৷ তাতে দুশ্চিন্তা আরো বাড়ছে৷ আওয়াজটা থেকে শত্রুপক্ষের গতিবিধি আন্দাজ করা যায়৷ মেঝের অল্প অংশই মাদুরে ঢাকা৷ অবশিষ্ট উন্মুক্ত অংশ খাটের চতুর্দিকেই ছড়িয়ে আছে৷ কান খাড়া করে থাকতে থাকতে কান ব্যথা হয়ে যাচ্ছে৷ একটা আলো চাই৷ ফণা তোলা উদ্যত রূপ যতই ভয়ংকর হোক, অদৃশ্য শত্রুর চেয়ে অন্ততঃ ভালো৷ টর্চ অবধি পৌঁছনো যাবে না৷ ঘরের লাইটের সুইচটা কোথায় ছিল? মনে মনে সারা ঘরের দেওয়ালটা হাতড়ে দেখি৷ নাঃ, মনে পড়ছে না৷ তবে বাথরুমের সুইচটা কোথায় সেটা অবশ্য মনে আছে৷ আমার খাটের মাথার দিকে বাথরুমের দরজা, তার পাশেই দেয়ালে বাথরুমের সুইচ৷ সুতরাং একলাফে উঠে ওই সুইচটা একবার অন করে দিতে পারলেই হয়৷ কিন্তু সমস্যা একটাই৷ আমার খাটের মাথা থেকে সুইচের মধ্যে অন্ততঃ দেড়মিটার ফারাক৷ এবং ওই খানে কোনো মাদুর নেই৷ সাপটার অনেকক্ষণ কোনো আওয়াজ পাচ্ছি না৷ তার মানে ওটা আপাততঃ কোনো মাদুরবিহীন অংশেই রয়েছে৷ অতএব?

--খস্‌‌খস্!

কি আশ্চর্য, সাপটা এখনও সেই একই কোনায় রয়েছে! কিন্তু আশ্চর্য হয়ে সময় নষ্ট করার অবস্থায় আমি নেই৷ এই সুবর্ণ সুযোগ! আমি একলাফে খাটের মাথার দিক দিয়ে নেমে পড়ি, ঝড়ের বেগে দেয়াল হাতড়ে সুইচ টিপে দিই৷ বাথরুমের আধখোলা দরজা দিয়ে বাল্বের হলুদ রঙের আলো ছড়িয়ে পড়ল ঘরে৷ আমার এক পা এখনও খাটের প্রান্তে৷ অন্য পা মেঝেতে৷ এক হাত সুইচে৷ না, আমার পায়ের ধারেকাছে অন্ততঃ কোনো বিপজ্জনক সরীসৃপ চোখে পড়ছে না৷ কিন্তু শব্দটা যে কোনা থেকে আসছিল সেটা খাটের ওই দিকে, এখনও আমার চোখের আড়ালে৷ শব্দটা আপাততঃ হচ্ছে না৷ হঠাৎ আলোয় আমার শত্রুপক্ষের চোখ ধাঁধিয়ে গেছে হয়তো৷ হয় তো ঠাহর করার চেষ্টা করছে কোন দিক দিয়ে আক্রমণ করা যায়৷ আমার বর্তমান অবস্থান থেকেই সারা ঘরটা নিরীক্ষণ করে নিই৷ এই রকম কোনা থেকে ঘরটা দেখি নি আগে৷ খাটের একেবারে নীচে দেয়ালের কাছে একটা ওয়েষ্ট পেপার বাস্কেট চোখে পড়ল৷ গতরাতে একটা বিস্কুটের প্লাষ্টিক ফেলার জন্য একটা ওয়েষ্ট পেপার বাস্কেটের দরকার ছিল৷ শ্রীমান বিছানার তলায় এমন গভীরে সেঁধিয়ে ছিলেন যে তখন প্রয়োজনের সময়ে খুঁজে পাই নি৷ কিন্তু ওয়েষ্ট পেপার বাস্কেট আবিস্কার করেই ক্ষান্ত দিতে পারি না৷ তার চেয়ে অনেক গুরুতর জিনিস অপেক্ষা করছে খাটের ওইপ্রান্তে, যে প্রান্তটা এখনও আমার চোখের আড়ালে৷ অতি সন্তর্পনে পা টিপে টিপে বিছানায় উঠি, পাছে খাটের তলা দিয়ে ছুটে এসে ছোবল দেয় পায়৷ তারপর বিছানার চাদরটা বাগিয়ে নিই এক হাতে৷ ফণা তুললেই দেব চাপা দিয়ে৷ তারপর স্তব্ধনিঃশ্বাসে উঁকি মারি সেই রহস্যময় প্রান্তে৷

কিন্তু নাঃ, কোনো আশ্চর্য সরীসৃপ নেই সেখানে৷ সত্যি বলতে কি কিছুই নেই৷ খালি একটা ছোটো গর্ত আছে দেয়ালে৷ ওটার ভিতরেই কি সেঁধিয়েছে সাপটা? সন্তর্পনে খাটের নীচে তাকাই৷ সেখানেও কিছুমাত্র নেই৷ বিস্ময়ে বিমূঢ় হব কি না ভাবছি, এমন সময়ে--

আবার 'খস্‌‌খস্!'

ঝটিতে বিছানার চাদর হাতে তুলে নিয়ে সেই রহস্যময় কোনার দিকে তাকাই৷ এক মুহূর্ত আগেও ভেবেছিলাম ওখানে কিছুই নেই৷ এবার বুঝলাম কিছু একটা আছে--

নারকেলছোবড়ার মাদুরের উপর ফ্যানের হাওয়ায় বিস্কুটের পরিত্যক্ত প্লাস্টিক যে অমন খস্‌‌খস্ শব্দ করে কে জানত?

No comments:

Post a Comment